Showing posts with label আরশিতার প্রশ্ন. Show all posts
Showing posts with label আরশিতার প্রশ্ন. Show all posts
আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০৩

আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০৩

আরশিতার প্রশ্ন

ডাক্তার সিনহা আমাকে জানালেন গতকাল রাতে আরো একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। কোনো কারণ ছাড়া সুইসাইড? ভাবা যায়??

ওনার সাথে কথা শেষ করে যখন নিচে নামলাম, দেখলাম দারোয়ান করিম আরশিতাকে একটা চকলেট দিয়ে আরশিতার গাল স্পর্শ করছে। আরশিতাকে কি কি যেনো বলছে। আমার মনের ভিতরে সন্দেহ জাগলো।তারমানে কি করিম আরশিতার সাথে ওইসব? সাতপাঁচ কিছু ভাবতে পারছি না। আমার মনে হলো করিম সব নষ্টের মূল। মেজাজ প্রচন্ড গরম হলো। করিমের কাছে গিয়ে ওরে মাইর শুরু করলাম-
"শালা নিমকহারাম, কুত্তার বাচ্চা, তুই আমার মেয়ের সাথে এইসব"?
ইচ্ছামতো ওরে মাটিতে ফেলে মাইর দিচ্ছি। করিমের চিৎকার শুনে মিহি নিচে আসলো। আমাকে থামানোর চেষ্টা করলো। বললো-
"মেহরাব পাগল হয়ে গেছো তুমিইই? কি করছো এগুলো"?
মিহির দিকে রাগান্বিত ভাবে তাকালাম। ভয় পেলো। আমার এতোটা রাগি চোখ আগে কখনো দেখেনি।
মিহি জানেওনা আরশিতা আমাকে কি প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেছে। মিহি জানেওনা আরশিতার ওই একটা প্রশ্নের কথা ভেবে আমি এখন রাতে ঘুমাতে পারিনা।

করিমের মুখে জোরে জোরে আরো কয়েকটা কিল মারলাম।
মাটিতে থাকা অবস্থায় করিম কান্না করতে করতে বললো-
-স্যার আমি কি করছি? আমারে মারিয়েন না স্যার। আরশিতা ম্যাডামের মতো আমার একখান মাইয়া আছে গ্রামে, নিজের মাইয়াটারে দেখিনা বহুদিন, তাই আরশিতা ম্যাডামরে দেখলে নিজের মাইয়াটার কথা মনে পড়ে, একটু আদর করতে মন ছায়। আমারে আর মাইরেন না স্যার"।
করিমের এই কথাটা শুনে আমি মাইর থামালাম। করিমের একটা মেয়ে আছে এটা আমি জানি, আগে বলেছিলো আমায়। তারমানে করিম আরশিতার সাথে এসব করবেনা। মেয়েকে দেখেনা বহুদিন, হয়তো এজন্যই আরশিতাকে একটু আদর করতে ইচ্ছা হইছে"।

করিমকে মাটি থেকে তুললাম। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। মাথা নিচু করে আস্তে করে বললাম-
"সরি করিম, আমার মাথা ঠিক নেই। টেনশনের মাথায় পাগলামি করে ফেলছি"।
আমার মাথা আসলেই ইদানিং ঠিক রাখতে পারছিনা। সারাদিন মাথাটা ভারী হয়ে থাকে। মনেহয় মাথার ভিতরে কিছু দৌড়াচ্ছে, পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজছে, কিছু একটা।
ইদানিং মাঝেমাঝেই মনে হয় "আমি কি দিনদিন পাগল হয়ে যাচ্ছি"??
মিহিকে দেখলাম আমার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এই মেহরাব তার কাছে বড্ড অপরিচিত।
করিমের দিকে তাকালাম, দেখলাম কান্না করতে করতে শরীর মুছতেছে। আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে করিমের হাতে দিলাম। বললাম-
"কয়েকটা দিন গ্রাম থেকে ঘুরে আসো, তোমার বাচ্চাটার সাথে সময় কাটাও"।
কথাটা শুনে করিম কান্না করতে করতে একটা হাসি দিলো। কান্নার মধ্যে হাসি, কি অদ্ভুত সুন্দর এই হাসি"।
.
.
করিমকে খুশি করে, আরশিতাকে স্কুলে পৌছে দিয়ে থানায় আসলাম। সকালের ঘটনা মাথা থেকে সরাতে পারছিনা। যদিও করিমকে শেষে খুশি করেছি, কিন্তু এভাবে মাইর দেওয়াটা একদম উচিত হয়নি। কি করবো? আরশিতার প্রশ্নটা মাথায় এমনভাবে গেঁথে গেছে, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল কিছুই বুঝতে পারছিনা৷ এমন সময়
কন্সটেবল আসিফ এসে বললো-
-স্যার পারমিশন দিলে একটা কথা জিজ্ঞাস করি"?
-হু বলো"।
-কয়েকদিন ধরে দেখছি আপনি অনেক টেনশনে আছেন। ভাবছিলাম হয়তো রেপ কেসটা নিয়ে টেনশনে আছেন, কিন্তু এখন তো সেটা শেষ হয়েছে। আপনার চেহারায় তারপরেও টেনশন দেখা যাচ্ছে। কি হয়েছে স্যার"?
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আসিফকে বললাম-
-আরে তেমন কিছুনা, ওসমানীনগর হসপিটাল থেকে কল এসেছে, ওইখানে না'কি সবাই কোনো কারন ছাড়া সুইসাইড করছে৷ তার উপর আবার আরশিতার~~~ আমি থামলাম"।
আসিফ হয়তো বুঝতে পেরেছে মেয়েকে নিয়ে কিছু একটা টেনশনে আছি।
আসিফ বললো-
-স্যার আপনি ইদানিং একটু বেশিই চাঁপ নিচ্ছেন। আর কতো কাজ করবেন? আজকে বিকালে ফ্যামিলির সাথে কোথাও ঘুরে আসুন। ভাললাগবে"।
কথাটা খারাপ বলেনি আসিফ।
আমি সত্যি ভীষণ টায়ার্ড। আমার কিছুটা শান্তি দরকার, স্বস্তি দরকার।
ঠিক করলাম আরশিতার স্কুল ছুটির পর ওকে নিয়ে কোথাও ঘুরে আসবো"।
.
.
ছুটির ঘন্টাখানেক আগেই আরশিতার স্কুলে গেলাম। ক্লাস চলছে।
জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম, দেখলাম আরশিতার টিচার পলাশ একটা বাচ্চা মেয়েকে ওর কাছে ডেকে নিলো। মেয়েটার দিকে অন্যদৃষ্টিতে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো, কামুক দৃষ্টি বলা যায়। আমি বুঝতে পারলাম না কি হচ্ছে।
পলাশ প্রথমে মেয়েটার কাঁধে হাত দিলো, বাচ্চা মেয়েটা ভয় পাচ্ছে।
পলাশ আঙুল দিয়ে মেয়েটার ঠোঁট স্পর্শ করলো। তারপরে বুকে হাত দিলো। আমার মাথায় তখনো কিছু ঢুকছে না। বুঝতে পারছিনা পলাশ এসব কেনো করছে। এই ছেলেটাকে আমি বহুদিন থেকেই চিনি, অনেক ভালো ছেলে হিসাবেই জানি। কিন্তু এসব??
আমি অবাক হয়ে দেখতে থাকলাম।
বাচ্চা মেয়েটা এবার রীতিমতো ভয় পেয়ে কান্না শুরু করে দিছে। পলাশ এবার মেয়েটার দুই উরুর মাঝখানে হাত দিলো। ছিঃ।
উরুতে হাত রেখে বললো-
"আমার কাছে একটা জিনিষ আছে, ওটা খেলে তুমি অনেক মজা পাবে"।
কথাটা শুনা মাত্রই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। তারমানে পলাশের কাছ থেকেই আরশিতা??
আর কিছু বুঝার বাকি নেই আমার। ক্লাসের ভিতরে গিয়ে পলাশের শার্টের কলার ধরে জোরে জোরে থাপ্পড় মারা শুরু করলাম।
"শালা শুওরের বাচ্চা। তুই না শিক্ষক। থুউউ তোর মুখে। এত খারাপ কিভাবে একটা মানুষ হতে পারে? একটা বাচ্চার সাথে?? থুউউউ"।
ক্লাসে থাকা বাচ্চাগুলোকে দেখলাম বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভয় পাচ্ছে। এখানে বাচ্চাদের সামনে পলাশকে কিছু করাটা ঠিক হবেনা। কুত্তার বাচ্চাটাকে থানায় নিয়ে আসলাম।

থানায় নিয়ে এসে পলাশের শার্ট খুলে ওর হাত বাঁধলাম। প্যান্টের বেল্ট খুলে অবিরাম ওর পিঠে মাইর শুরু করলাম।
থানার সবাই অবাক হয়ে আমাকে দেখছে, আজ পর্যন্ত কোনো আসামীকে এভাবে মারতে কেউ আমাকে আগে দেখেনি। মাইর থামালাম একটা মেয়ের কন্ঠ শুনে। মেয়েটা বললো-
"ভাইয়া থামুন, ওরে মারিয়েন না আর"।মেয়েটাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি৷ মেয়েটার নাম রিয়া। আমাকে ভাই বলে ডাকে। মিহির ফ্রেন্ড, সেই সাথে ওর বড় পরিচয় হচ্ছে রিয়া এই লম্পট পলাশের স্ত্রী। মাইর থামিয়ে রিয়ার কাছে এসে বললাম-
-তুমি জানো পলাশ কি কি করেছে? তুমি জানো ও কতোটা খারাপ?? ছিঃ। আমার তো মুখে বলতেও ঘিন্না লাগছে"।
-আমি জানি ভাইয়া। সব জানি"।
রিয়ার কথা শুনে প্রচন্ড অবাক হলাম। রিয়া সব জানে? বললাম-
-তুমি সব জানো? তুমি জানার পরেও চুপ করে ছিলে? রিয়া, আমার তো এখন তোমাকে ঘিন্না লাগছে"।
-ভাইয়া এখানে পলাশের কোনো দোষ নেই, পলাশ পেডোফিলিয়াতে আক্রান্ত"।
ভ্রু কুঁচকে রিয়ার দিকে তাকালাম। বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম-
-পেডোফিলিয়া? এটা আবার কি"?
রিয়া মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। একদম চুপচাপ। নিঃশব্দ। হয়তো আমাকে কিভাবে বলবে বুঝতে পারছেনা, লজ্জা পাচ্ছে।
কিছু সময় পর বললো-
- পেডোফিলিয়া একটি মানসিক রোগ ভাইয়া, যারা শিশুদের প্রতি যৌনাকৃষ্ট হয়ে থাকে"।
এই প্রথম আমি এরকম রোগের নাম শুনছি। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। রিয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, দেখলাম মেয়েটার বাম চোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা পানি পড়ছে। কান্না জড়িত কন্ঠে রিয়া আবারো বললো-
- ভাইয়া লাস্ট ১বছর ধরে পলাশ আমার শরীরে একটাবারের জন্যেও ওইভাবে স্পর্শ করেনি। একজন স্ত্রীর কাছে এর চাইতে বড় কষ্ট আর কি হতে পারে?
বাসায় ১১বছরের কাজের মেয়েটার শরীরে দেখতাম মাঝে মাঝেই হাত দিতো, তাকিয়ে থাকতো, আমি বুঝতে পারতাম এগুলো কোন টাইপ দৃষ্টি। কোনো মেহমান বাচ্চা নিয়ে আসলে পলাশ খেলার অজুহাতে বাচ্চাটার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতো। আমি বুঝতাম। সব বুঝতাম।
লজ্জা শরমে কাউকে কিছু বলতে পারছিলাম না, আবার সইতেও পারছিলাম না। তারপর এসব নিয়ে যখন কানাডায় থাকা আমার বড় আপির সাথে কথা বলি, তখন ওনি বলেন ওনার স্বামী মানে আমার জিজু ডাক্তার মাসুদের সাথে কথা বলতে। আমি জিজুর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এটা পেডোফিলিয়া। মানে শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ"।
কথাটা বলেই রিয়া আবার কান্না শুরু করলো। আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটার ভিতরটা দুমড়েমুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ঐ মুহুর্তে রিয়াকে কি বলবো বা আমার ঠিক কি করা উচিত আমি জানিনা"।
মোবাইলের রিংটা বেজে উঠলো, ডাক্তার সিনহার কল। ধরলাম। ওনি কিছু বলার আগেই আমি জিজ্ঞাস করলাম-
- আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আপনাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে পেডোফিলিয়া বলতে কোনো রোগ আছে"?
- জ্বী পেডোফিলিয়া নামে একটা মানসিক রোগ আছে। এই ধরনের রোগীরা সাধারণত বাচ্চাদের প্রতি যৌনাকৃষ্ট হয়ে থাকে। অনেক আগে থেকে এই রোগটা থাকলেও ১৯৯৭ সালে এটাকে রোগ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়"।
- এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই"?
- হু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বা খুব বেশি দেশে এটার উন্নত কোনো চিকিৎসা নেই বললেই চলে। তবে যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় পেডোফিলিয়ার খুব ভালো পূর্ণবাসনের পক্রিয়া চালু হয়েছে"।
- আচ্ছা ধন্যবাদ"। আমি পরে কল দিচ্ছি"।
ফোনটা কাটতে যাবো ঠিক এমন সময় ডাক্তার সিনহা আবারো বললেন-
- মেহরাব স্যার শুনুন, যেটার জন্য আপনাকে কল দিছি, একটু আগেও আমাদের হসপিটালে একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। অথচ তাকে আমরা আগামীকালকে রিলিজ করে দেওয়ার কথা ছিলো। আপনি প্লিজ কিছু একটা করুন। প্লিজ"।
ডাক্তার সিনহার কথা শুনে আমি কিছু সময় চুপ করে থাকলাম। বললাম-
- এই বিষয়ে আপনার সাথে একটু পরে কথা বলি"?
- ঠিক আছে"।

ফোনটা কেটে রিয়ার দিকে তাকালাম। মেয়েটা এখনো অবিরাম কান্না করে যাচ্ছে। রিয়াকে বললাম-
- কি করতে চাচ্ছো এখন"?
কান্না জড়িত কন্ঠে রিয়া বললো-
- ভাইয়া আমি কিচ্ছু জানিনা, জিজু বললো কানাডায় ওনাদের কাছে না'কি পলাশকে নিয়ে যেতে হবে। এই কয়দিনে ভিসার সব কাজ শেষ। এখন আগামী এক সপ্তাহের ভিতর টিকেট কনফার্ম করে পলাশকে নিয়ে আপুদের কাছে চলে যাবো। দেখি ওখানে গিয়ে কি হয়"।
রিয়ার চোখের পানিগুলো থামছেনা। থামার কথাও না। একটা নারীর কষ্ট এই পৃথিবীতে সবার বুঝার ক্ষমতাও নেই। আমি রিয়ার মাথায় হাত রেখে বললাম-
"পলাশকে নিয়ে যাও। চিন্তা করিওনা, সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন"।
রিয়া পলাশের হাতটা ধরে হাঁটা শুরু করলো। আমি ওদের চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কি অদ্ভুত আমাদের এই পৃথিবী।

ওরা চলে যাওয়ার পর কন্সটেবল আসিফ বললো-
"স্যার হসপিটালের বিষয়টা কি করবেন? কেউ এমনি এমনি কোনো কারণ ছাড়া সুইসাইড কেনো করবে? আমার তো কিছু গন্ডগোল লাগছে স্যার"।
আমি আসিফের দিকে তাকিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম-
"চলো, এবার তাহলে হসপিটাল থেকেই ঘুরে আসা যাক"।

আসছে হসপিটাল রহস্য....প্রতিদিন ভিজিট করে সাথেই থাকুন
আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০২

আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০২

আরশিতার প্রশ্ন

প্রত্যেকটা থানায় আরশিতার ছবি মেইল করে বললাম যাতে বাস স্ট্যান্ড, সবগুলো পয়েন্ট, চেক করে তারপর যেনো গাড়ি ছাড়ে। বাসার দারোয়ান করিমকে কল দিলাম, বললাম "আরশিতা বাসায় আসলে আমাকে আর মিহিকে যেনো তাড়াতাড়ি জানায়"।
আমার মাথায় কোনোকিছু কাজ করছিলো না। হুট করে কি হয়ে গেলো?
একদিকে আরশিতাকে খুজে পাচ্ছিনা, অন্যদিকে রেপ হওয়া মেয়েটার খুনিরাও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওই মেয়েটাও কলেজের সামনে থেকে কিডন্যাপ হয়েছিলো।

কিছু ভাবতে পারছিনা আমি। টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা থেকে একটু পানি খেলাম। এমন সময় খেয়াল করলাম ওই বুড়ো লোকটা আবারো এসেছেন, ওইদিন ও এসেছিলেন। লোকটার দিকে তাকালাম, স্পষ্ট দেখতে পেলাম বুড়ো লোকটার চোখ থেকে অবিরাম পানি পড়ছে। ওইদিন আরশিতার করা প্রশ্নের টেনশনে কোনো কথা বলা হয়নি ওনার সাথে, যদিও এখনো আমার মাথায় হাজারটা টেনশন ঘুরছে। সবচাইতে বড় টেনশন তো আমার কলিজার টুকরা মেয়েটাকে খুজে পাচ্ছিনা, তারপরেও ওনার দিকে তাকিয়ে কেনো জানিনা খুব মায়া হলো।
চেয়ার থেকে উঠে ওনার কাছে গেলাম। বললাম-
-চাচা, কি সমস্যা আমাকে বলুন"?
ওনি চোখগুলো বাম হাত দিয়ে মুছলেন। চোখের পানিগুলো লুকানোর বৃথা চেষ্টা। কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন-
-আমার মাইয়াটারে ৩দিন ধইরা খুইজা পাইতাছিনা স্যার"।
কথাটা শুনে আমার বুকটা ধুক করে উঠলো। আরো একটা মিসিং কেস? কি হচ্ছে এসব?? প্রথমে একটা মেয়ে নিখোঁজ, তারপর রেপ, তারপর লাশ, এখন আরশিতা নিখোঁজ, সাথে ওনার মেয়েও। উফফফফ, আমি কিছু ভাবতে পারছিনা। কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম। চাচাকে জিজ্ঞাস করলাম-
-চাচা আপনার মেয়ে কিসে পড়ে? কোনো ছবি নিয়া আসছেন ওর"?
-বাজান ও তো কলেজে পড়ে। আমি পড়ালিখা কিছু করতে পারিনাই, আমার স্বপ্ন ছিলো মেয়েটারে উকিল বানামু, কিন্তু ওইদিন কলেজ থাইকা আমার মেয়ে আর ফিরে নাই। এইযে তার ছবি"। ছবিটা দেখিয়েই ওনি কান্না শুরু করলেন। আমি অসহায় একটা বাবার কান্না দেখতে থাকলাম। যদিও আমারো এখন ইচ্ছা করছে জোরে জোরে কান্না করতে, কিন্তু পারছিনা। চাচার কাধে হাত রেখে বললাম-
-আপনার মেয়েকে আমরা খুজে বের করবো, টেনশন করিয়েন না"।
এমন সময় মোবাইলের রিংটা বেঁজে উঠলো, দারোয়ান করিম কল দিছে। ধরলাম। করিম বললো-
"স্যার আরশিতা ম্যাডাম তো বাসায় আইছে মাত্রই"।
কথাটা শুনা মাত্র আমি তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে।
.
বাসায় গিয়ে দেখি আরশিতা চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। ভীত চেহারা। আরশিতার কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো চুমু খেলাম। বললাম-
-আম্মু কোথায় গেছিলে স্কুল ছুটির পর? তুমি জানো পাপা তোমাকে না পেয়ে কতোটা টেনশনে ছিলাম"।
আরশিতা ভীত চেহারা নিয়ে বললো-
"আমি আমার ফ্রেন্ড রিফাতের সাথে খেলতে গেছিলাম পাপা"।
আমি বুঝতে পারলাম আরশিতা কিছু লুকাচ্ছে। আমার মেয়েটা এমন ই, সহজে কিছু বলতে চায়না"।
এই বিষয়ে ওর সাথে আর কোনো কথা বললাম না, ভাবলাম সময় হলে এমনিতেই সব জানা যাবে"।
.
পরেরদিন সকালে স্কুলে যেতে আরশিতার আবারো একিই আবদার "স্কুলে যাবোনা"।
মেয়েটা কি প্রতিদিন রেডি হওয়ার সময় এমন করে? কি জানি, মিহিই তো প্রতিদিন আরশিতাকে রেডি করায়। একপ্রকার জোর করেই আরশিতাকে রেডি করালাম, সত্যি বলতে মিহির অভাবটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
মিহিকে কল দিয়ে বললাম বাসায় চলে আসতে।
.
আরশিতাকে নিয়ে স্কুলে গেলাম।
কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে আরশিতা গাড়ি থেকে নামছেনা, আমার একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে।
আরশিতার দিকে ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলাম স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৩টা ছেলের দিকে ভীত চেহারায় তাকিয়ে আছে। এই ভীত চেহারাটা আমি গতকালকেও আরশিতার মুখে দেখেছি। আরশিতার গালটা স্পর্শ করে বললাম-
-আম্মু কি হয়েছে? ভয় পাচ্ছো"?
আরশিতা ছেলেগুলোর দিকে ইশারা করে বললো-
-পাপা ওই মানুষগুলো অনেক খারাপ, অনেক পচা"।
কৌতূহল জাগলো মনের ভিতর। জিজ্ঞাস করলাম-
-ওরা কি করেছে মামনী"?
আরশিতা ভয়ার্ত কন্ঠে বললো-
- গতকাল স্কুল ছুটির পর আমি আর আমার ফ্রেন্ড রিফাত, আর সুমা, আমরা ভূতদের নিয়ে কথা বলছিলাম।
আমি ওদের বললাম পাপা আমাকে বলেছে ভূত বলতে কিছু নেই।
ওরা হাসলো। রিফাত বললো ওদের বাড়ির পাশে যে জংগল আছে ওইখানে না'কি ভূত থাকে, আমাকে দেখাতে পারবে। আমি ভূত দেখার জন্য ওর সাথে গেলাম, সুমাও ছিলো আমাদের সাথে। জংগলের একটু ভিতরে যেতেই দেখলাম একটা ছোট টিনের ঘর থেকে একটা মেয়ে কান্না করছে। আমি ভীষণ ভয় পেলাম, রিফাত ও ভয় পাচ্ছিলো।
আমরা আস্তে আস্তে ঘরের কাছে গেলাম, গিয়ে দেখলাম এই ৩টা ছেলে একটা মেয়েকে অনেক মারছে, আর মেয়েটা অনেক কান্না করছিলো পাপা। আমরা ভয় পেয়ে সাথে সাথে ওইখান থেকে পালিয়ে আসি"।
আরশিতার কথাটা শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম। কয়েকটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলো।
আরশিতা বললো "একটা মেয়েকে মারতে দেখেছে"।
তারমানে কি আরশিতা নোংরামি করতে দেখেছে? নোংরামিকে মারা বলছে?
সদ্য নিখোঁজ হওয়া মেয়েটাকে কি এই ছেলেগুলোই কিডন্যাপ করেছে? আরশিতা কি ওই বুড়ো চাচার মেয়েটাকেই দেখলো? রেপ হয়ে মারা যাওয়া মেয়েটার খুনিও কি এরাই?
স্বাভাবিক হয়ে আরশিতাকে বললাম-
"আম্মু তুমি স্কুলে যাও, ভয় পাওয়ার কিছু নাই। পাপা আছি'তো"।
আরশিতা গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের ভিতর গেলো।

গাড়িতে থেকেই থানায় কল দিলাম। বললাম ৩-৪জন যাতে নরমাল পোশাকে স্কুলের সামনে আসে।
ওরা আসলো। আমরা ছেলেগুলোকে ফলো করা শুরু করলাম"।

সারাদিন ছেলেগুলো একদম নরমাল জীবন যাপন করছিলো, যেমনটা সবাই করে। কিন্তু লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে ওরা ৩জন একটা মুহুর্তের জন্য ও আলাদা হয়নি, বিষয়টা অদ্ভুত।
রাত ১০টার দিকে ওরা একটা বাইক নিয়ে জংগলের দিকে গেলো, আমরাও পিছু পিছু গেলাম। জংগলের অনেক ভিতরে ছোট একটা টিনের ঘর, যেমনটা আরশিতা বলছিলো। ছেলেগুলো ঘরের ভিতরে ঢুকলো, পিছন পিছন গিয়ে আমরাও ঘরের ভিতরে ঢুকলাম।
ঘরে ঢুকে দেখলাম ওই বুড়ো চাচার মেয়েটা বস্ত্রহীন অবস্থায় অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। শরীর রক্তাক্ত।
বুঝতে বাকি রইলোনা কুত্তার বাচ্চাগুলো ওর সাথে কি কি করেছে।
কোনো কথা না বলেই আমি ওদের ৩জনের পায়ে গুলি করলাম। কয়েকটা লাত্তি মেরে বললাম-
-জানোয়ারের বাচ্ছারা, তোরা মানুষের ঘরে জন্ম নিছিস"?
৩টা ছেলেই পাগলের মতো হাসতে শুরু করলো। পায়ে গুলি লাগার পরেও কাউকে এভাবে হাসতে এই প্রথম দেখলাম। মনে মনে ভাবছি "ওরা কি সাইকো"? একটা ছেলে বললো-
-স্যার, আমরা সমাজের ভালা কাজ করতেছি"।
ছেলেটার কথা শুনে একদিকে অবাক হলাম অন্যদিকে প্রচন্ড রাগ হলো। বললাম-
-শালা কুত্তার বাচ্চা, রেপ করে মেয়েটার হাত পায়ের আঙুল কেটে খুন করা সমাজের ভালো কাজ"?
-স্যার আমরা যারে খুন করছি ওই মেয়েটা একটা বেশ্যা। কলেজে ৪০টা পোলার সাথে টাংকি মারে। এইযে আমাদের ৩জনরে দেখতেছেন না, আমরা ৩জন ছিলাম না,৪জন ছিলাম। সেই ছোট থাইকাই ৪জন ছিলাম জানে জিগার দোস্ত। ওই মেয়েটা আমাদের বন্ধুটারে ইউজ কইরা, ভালোবাসার লোভ দেখাইয়া, মায়ায় জড়াইয়া, ছাইড়া দিছে। আমার বন্ধুটা সহ্য করবার পারে নাই স্যার, সুইসাইড কইরা ফেলছে। মন ভাঙার কষ্টটা আপনি বুঝবেন না স্যার। আমার বন্ধুর মতো অনেক ছেলে সুইসাইড করবার চায়, শুধুমাত্র এসব বেশ্যা মেয়েদের মায়ায় জড়াইয়া। তাই আমরা ঠিক করছি দশ বারোটা পোলার সাথে টাংকি মারা কোনো মাইয়ারে আমরা এই দুনিয়ায় রাখমু না। আমার বন্ধুর মতো আর কাউরে মরতে দিমুনা। এইযে এই মাইয়াটারে দেখতাছেন না, এই মাইয়াও ওই টাইপের, অনেক পোলার জীবন নষ্ট করবো"।
ওদের কথা শুনে আমার এত্ত রাগ হলো, ইচ্ছা করছিলো এখানেই গুলি করে ৩টাকে মেরে দেই। মেয়েগুলো খারাপ হোক বা ভালো। ওদের রেপ করে, লজ্জাস্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত করে, হাত পায়ের আঙুল কেটে, এরকম ভয়ংকর ভাবে মেরে ফেলার অধিকার তোদের কে দিছে"?
নিজের রাগটা কন্ট্রোল করলাম।
ওদেরকে থানায় রেখে আসলাম।
মেয়েটাকে ওসমানীনগর হসপিটালে নিয়ে যেতে বললাম। বুড়ো চাচাকেও ফোন করে বললাম যাতে ওনি হসপিটালে চলে আসেন।

ফোনটা রাখার সাথে সাথেই আমার কাছে একটা কল আসলো। আননোন নাম্বার। ধরলাম-
-হ্যালো পুলিশ অফিসার মেহরাব বলছেন"?
-জ্বী মেহরাব বলছি, কে আপনি"?
-স্যার আমি আপনাদের ওসমানীনগর নতুন হসপিটালটার হেড "ডাক্তার সিনহা"।
প্রচন্ড অবাক হলাম। ওসমানীনগর হসপিটাল? এই মেয়েটাকে আমি মাত্রই ওসমানীনগর হসপিটালে নিতে বলেছি। ওনি আবার বলা শুরু করলেন-
-স্যার আমাদের এইখানে লাস্ট ১সপ্তাহ ধরে অদ্ভুত সব কান্ড হচ্ছে। কোনো মেয়ে এখানে ভর্তি হলে তারা গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করছে। কোনো ছেলে ভর্তি হলে তারা নিজের ইচ্ছায় হাতের রগ কেটে, ছাঁদ থেকে লাফ দিয়ে সুইসাইড করছে। কোনো কারণ ছাড়াই। আমরা হসপিটালের সম্মানের জন্য এসব লুকিয়ে যাচ্ছিলাম। বুঝতেই তো পারছেন নতুন হসপিটাল"।
আমি ডাক্তারের কথা শুনে রীতিমতো ভয় পেলাম। মেয়েরা গলায় দড়ি দিচ্ছে? ছেলেরা হাতের রগ কেটে সুইসাইড করছে?? মাই গড। কি হচ্ছে এগুলো?
কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ডাক্তারকে বললাম-
-আমি আগামীকাল আপনার সাথে সরাসরি দেখা করে কথা বলতে চাই"।
-ঠিক আছে, সন্ধ্যায় চলে আসুন হসপিটালে"।
-হু ওকে"।
ফোনটা রেখে রেখে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বাসায় আসলাম। মনটা একটু হালকা লাগছিলো রেপ কেসটা সমাধান করে, কিন্তু ডাক্তারের কলটা আসার পর আরো একটা ভয়ংকর কেস চলে আসলো সামনে"।
রুমে ঢুকে দেখলাম মিহি চলে এসেছে। আমাকে দেখা মাত্রই বললো-
"তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও, টেবিলে খাবার দিচ্ছি"।
আমি কিছু সময় মিহির দিকে তাকিয়ে রইলাম৷ কেনো জানিনা আমার মনে হলো আমি অনেক বছর পর মিহিকে দেখছি, আমার ভালোবাসার মানুষটাকে দেখছি।

খাবার খেতে খেতে বললাম-
-আরশিতা কি ঘুমিয়ে গেছে"?
-হু অনেক আগেই ঘুমিয়েছে, এই কয়দিনে আমার মেয়েটাকে একদম শুকিয়ে ফেলেছো"।
মিহির কথা শুনে ফিক করে হাসলাম। মায়েদের মনটা সবসময় এমন ই হয়।
খাবার শেষ করে বিছানায় শরীরটা দিতেই চোখ লেগে আসলো। দেখলাম আরশিতা আমাকে জিজ্ঞাস করছে
"পাপা তোমরা যেটা দিয়ে হিসু করো ওইটা কি কোনো বাচ্চাকে খাইয়েছো"?
আমি তাড়াতাড়ি চোখটা খুলে বিছানায় উঠে বসলাম। একটু পানি খেলাম। বড় একটা নিশ্বাস নিয়ে মনে মনে বললাম "আরশিতার মাথায় এই প্রশ্নটা কিভাবে আসলো এটা না জানা অবধি আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারবোনা। একদম না।

পরেরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য আরশিতা রেডি হলো। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করছি, আরশিতা আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক এমন সময় হসপিটাল থেকে আবারো কল আসলো, ডাক্তার সিনহার কল। আরশিতার সামনে এসব বিষয়ে কথা বলাটা একদম ঠিক মনে করলাম না। আরশিতাকে বললাম-
"মামনী তুমি গাড়ির কাছে গিয়ে অপেক্ষা করো, পাপা একটা ফাইল খুঁজে বের করে তারপর আসছি"।
আরশিতা নিচে গেলো। ডাক্তার সিনহা আমাকে জানালেন গতকাল রাতে আরো একটা মেয়ে সুইসাইড করেছে। কোনো কারণ ছাড়া সুইসাইড? ভাবা যায়??
ওনার সাথে কথা শেষ করে যখন নিচে নামলাম, তখন দেখলাম দারোয়ান করিম আরশিতাকে একটা চকলেট দিয়ে আরশিতার গাল স্পর্শ করছে। আরশিতাকে কি কি যেনো বলছে। আমার মনের ভিতরে সন্দেহ জাগলো। তারমানে কি করিম আরশিতার সাথে ওইসব?

শেষ পার্ট আসছে...
আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০১

আরশিতার প্রশ্ন - পর্ব: ০১

আরশিতার প্রশ্ন

বিছানায় বসে বসে চা খাচ্ছিলাম। ঠিক এমন সময় আমার সাত বছরের বাচ্চা মেয়ে আরশিতা বললো-
"পাপা তুমি যেটা দিয়ে হিসু করো ওইটা কি কোনো ছোট মেয়েকে খাইয়েছো? ওটা খেতে কি চকলেটের মতো"?

আরশিতার মুখে কথাটা শুনে আমার বুকটা ধুক করে উঠলো৷ হাতে থাকা চায়ের কাপটা মাটিতে পড়ে গেলো। কি বললো আমার মেয়ে? আমি এখনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। আরশিতার দিকে একবার তাকালাম, একটু আগে আমাকে কতো বড় প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেছে সেদিকে তার একটুও খেয়াল নেই। খুব মনোযোগ দিয়ে খেলা করছে।
আমি এই বিষয়ে ওর সাথে আর কোনো কথা বললাম না।
কিন্তু আরশিতার মনের ভিতর এই প্রশ্নটা আসলো কিভাবে?
আমি আমার মেয়েকে মোবাইল বা ল্যাপটপ স্পর্শ করতে দেইনা, তাই ইন্টারনেটে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আর এতোটুকু মেয়ে ইন্টারনেটের কি'ই বা বুঝে? তাছাড়া আমি আমার স্ত্রী মিহির সাথেও ওইধরনের কোনো নোংরামি করিনি, যেটা আরশিতা দেখে ফেলবে।
তাহলে কি মিহি অন্য কারো সাথে পরকীয়া করে? আরশিতা কি সেটা দেখে ফেলেছে?
ছিঃ ছিঃ। কি নোংরা কথা ভাবছি আমি। মাথা থেকে আরশিতার কথাটা সরানোর চেষ্টা করলাম।

পরেরদিন সকালে টেবিলে বসে চা খাচ্ছি, কিন্তু বারবার আরশিতার বলা কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এতোটুকু মেয়ের মনের ভিতর ওই টাইপের প্রশ্ন? কিভাবে সম্ভব??
আমাকে আনমনা দেখে মিহি জিজ্ঞাস করলো-
-আজকে থানায় তোমার কাজ নাই মেহরাব? অন্যদিন তো খুব তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে যাও"।
মিহির দিকে একবার বিষ্ময় চোখে তাকালাম। বললাম-
-কেনো? আমি চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছো না'কি? আমি চলে গেলে ভালো হয়"?
-কি আজব কথাবার্তা। এমনভাবে বলছো কেনো"?
মিহির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বের হয়ে গেলাম।

থানায় এসে কাজে একদম মন বসাতে পারছিনা। আমার সামনেই গতকাল রেপ হয়ে মারা যাওয়া একটা মেয়ের পোস্টমোর্টেম রিপোর্ট পড়ে আছে। আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা করছেনা সেটা খুলে দেখতে।
একটা বুড়ো লোককে দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে কমপ্লেইন লিখাচ্ছে। অন্যদিন হলে নিজেই গিয়ে জিজ্ঞাস করতাম
"কি হয়েছে"?। কিন্তু আজকে আমার নিজের মনেই শান্তি পাচ্ছিনা। বারবার আরশিতার প্রশ্নটা কানে বাজছে।
আমার রীতিমতো মিহিকে সন্দেহ হচ্ছে। আমি জানি আমি উল্টাপাল্টা ভাবছি, কিন্তু মাথা থেকে কোনোভাবেই এসব নোংরা চিন্তাগুলো ফেলে দিতে পারছিনা।

বাসায় ফেরার সময় গেইটের কাছে এসে থামলাম। দারোয়ান করিমকে বললাম-
-আমি থানায় যাওয়ার পর বাসায় কে কে আসে"?
প্রশ্নটা শুনার জন্য করিম হয়তো প্রস্তুত ছিলোনা। মাথা নিচু করে বললো-
-কই কেউ আহেনা তো স্যার"।
আমি ঠাসসসস করে ওর গালে একটা থাপ্পড় মারলাম।
-সত্যি করে বল আমি থানায় যাওয়ার পর বাসায় কেউ আসে কি'না"?
বুঝতে পারলাম করিম রীতিমতো ভয় পাচ্ছে। আমতা আমতা করে বললো-
-আপনে থানায় যাওয়ার পর, আর আরশিতা মামণি ইসকুলে যাওয়ার পরে দুইদিন একটা ছেলে আইছিলো ম্যাডামের লগে দেহা করতে"।
-ছেলে? কেমন ছেলে? বয়স কতো"?
-এই ধরেন স্যার ছব্বিশ পছিশ হইবো"।
কথাটা শুনে অনুভব করলাম হৃদপিণ্ডে ধড়াম ধড়াম আওয়াজ হচ্ছে। কেউ হাতুড়ি পিটা করছে। করিমকে জিজ্ঞাস করলাম-
-আরশিতা স্কুলে যাওয়ার পর তোর ম্যাডাম কি কখনো বাইরে যায়"?
- হ যায়তো স্যার, ম্যাডাম তো প্রায়ই একলা যাওয়োন আহোন করে"।
করিমের সাথে এই বিষয়ে আর কোনো কথা বাড়ালাম না। বাসায় এসে মিহির সাথেও ওইদিন আর কোনো কথা বলিনি"।

পরেরদেন সকালে নাস্তা করে বাসা থেকে বের হলাম। রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি মিহি বের হয় কি'না দেখার জন্য।
ঘন্টাখানেক পর মিহি বের হলো। খুব সুন্দর করে সাজুগুজু করেছে।
একটা রিক্সা ডাক দিয়ে রিক্সায় উঠলো মিহি, আমিও পিছন পিছন একটা রিক্সা নিলাম।

একটা পার্কের কাছে গিয়ে মিহি রিক্সাটা থামালো। দেখলাম একটা যুবক ছেলে বসে আছে। হয়তো মিহির জন্য অপেক্ষা করছে। মিহি গিয়ে ওর কাছে বসলো৷ ছেলেটা মিহির হাত ধরা মাত্রই আমার মেজাজটা এত্ত বেশি খারাপ হলো, নিজের রাগটা আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না।
ওদের কাছে গিয়ে প্রথমেই ছেলেটাকে দুই তিনটা কানের নিচে থাপ্পড় মারলাম।
মিহির চেহারা একদম ভীত হয়ে গেছে।
মিহির গালেও ঠাসস করে থাপ্পড় মারলাম। এই প্রথম, এই প্রথম আমি আমার ভালোবাসার মানুষটার গায়ে হাত তুলছি৷ অবশ্য ভালোবাসার মানুষ বলতেও এখন লজ্জা লাগছে। মিহিকে ছোট করে একটা প্রশ্ন করলাম-
- তুমি এসব পাপ কাজ করছো করো। কিন্তু আরশিতার সামনে কেনো"?
মিহি কান্না করছে, অবিরাম কান্না করছে। একিই সাথে চেহারায় স্পষ্ট দেখতে পেলাম মিহি ভীষন অবাক হয়েছে। কান্না করতে করতে বললো-
-মেহরাব আমি নিরুপায় ছিলাম। আমার কিছু করার ছিলোনা। রাহাত আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার সাথে দেখা করতে চাইতো। কিন্তু আমি ওর সাথে কোনো পাপ কাজ এখনো করিনি৷
আরশিতার সামনে করার তো কোনো প্রশ্নই আসেনা"।
বুঝতে পারলাম ছেলেটার নাম রাহাত।
কিন্তু আমি এখনো জানিনা ছেলেটা কিভাবে কিসের জন্য মিহিকে ব্ল্যাকমেইল করছে।
আমার মাথায় স্রেফ ৪টা কথা ঢুকলো।
"আমি নিরুপায়"
"আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে"
"পাপ কাজ এখনো করিনি"
"আরশিতার সামনে অবশ্যই না"।
এই ৪টা কথা আমাকে ঘুরেফিরে আমার মেয়ের প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মিহিকে এসব করতে না দেখলে আরশিতার মাথায় ওই প্রশ্নটা আসলো কিভাবে???

মিহিকে জিজ্ঞাস করলাম-
-তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করে মানে? তুমি এই ছেলেকে কতোদিন ধরে চিনো"?
মিহি কান্না জড়িত কন্ঠে বললো-
-ওর নাম রাহাত। ৪মাস আগে ওর সাথে আমার ফেসবুকে পরিচয়। আমি ওরে ভালো একটা ফ্রেন্ড মনে করেছিলাম মেহরাব। বিশ্বাস করে আমার দুই একটা পিক দিছিলাম। আর এখন এগুলো ইডিট করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে দেখা করতে চায়"।
মিহির কথা শেষ হবার পর আমি কিছু বলার আগে ছেলেটা বললো-
-চার মাস না স্যার, চার বছর। চার বছর ধরে আমি মিহিকে ভালোবাসি। সেই কলেজ লাইফ থেকে। আমি'তো বেশি কিছু চাইনা স্যার, আমি শুধু মিহিকে প্রতিদিন একবার দেখতে চাই, ওর কন্ঠটা একটাবার শুনতে চাই"।
কথাটা শুনে মিহি অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো, বুঝতে পারলাম মিহি এসবের কিছুই জানেনা। একটা না বলা ভালোবাসার গল্প।
আমার মনে হলো "ছেলেটা তো ভালোবেসেছে, ওকে আর মারাটা ঠিক হবেনা"। ছেলেটাকে বুঝিয়ে বললাম-
"বিয়েটা তো উপরওয়ালার হাতে, কার সাথে কার বিয়ে হবে সেটা কেউই বলতে পারেনা। এখন যেহেতু মিহির বিয়ে হয়েই গেছে, তো তোমার উচিত এখন ও যেনো ভালো থাকে এটা দোয়া করা। ওকে আর ডিস্টার্ব না করা"।
আমার কথাটা শুনে ছেলেটা বুঝতে পারলো। আমি মিহিকে নিয়ে বাসায় চলে আসলাম"।

একে তো আমার মাথায় সারাদিন আরশিতার বলা কথাটা ঘুরপাক খেতে থাকে, তার উপর আবার মিহির এই কান্ড, আমি একদম নিতে পারছিলাম না এসব। মিহিকে ডাক দিয়ে বললাম-
-আমার মনে'হয় তুমি কিছুদিন তোমার বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসো। আমি কয়েকটা দিন একলা থাকতে চাই"।
মিহি কিছু সময় চুপ করে রইলো। তারপর বললো-
-আমি আরশিতাকেও সাথে করে নিয়ে যাই"?
-নাহ, আরশিতা আমার কাছেই থাকুক। এই কয়েকদিন আরশিতাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা আমিই করবো"।
মিহি আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। হয়তো বুঝতে পেরেছে আমি কোনোকিছু নিয়ে টেনশনে আছি।
কোনো কথা না বলেই রুমে চলে গেলো ব্যাগ গুছাতে"।

পরেরদিন সকালে আরশিতাকে রেডি করাচ্ছিলাম স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আরশিতা বললো-
-পাপা আমি স্কুলে যাবোনা"।
-কেনো মামনী? আজকে আম্মু রেডি করিয়ে দিচ্ছেনা বলে"?
-নাহ পাপা, তুমি তো বলেছো আম্মু এক দুইদিনের ভিতরে চলে আসবে।
কিন্তু পাপা পলাশ টিচারটা আমাকে অনেক মারে, আমি ব্যাথা পাই"।
আমি আরশিতার কপালে একটু চুমু খেলাম। বললাম-
-হোমওয়ার্ক না করে গেলে টিচার তো মারবেই, তাইনা? তারপরেও আমি পলাশ টিচারকে খুব করে বকে দিবো আজকে, ওনার কতো বড় সাহস ওনি পুলিশের রাজকন্যাকে মারেন।
কিন্তু হোমওয়ার্কটা ঠিকঠাক মতো করতে হবে। ঠিক আছে মামনী"?
আমার কথা শুনে আরশিতা হাসলো৷ একটা বাচ্চার হাসি, নিষ্পাপ হাসি, পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর হাসি।

আরশিতাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে থানায় গেলাম। বারবার মাথায় একটাই প্রশ্ন আসছিলো "এতোটা নিষ্পাপ আমার মেয়ে, এই নিষ্পাপ মেয়েটার মাথায় ওই প্রশ্নটা আসলো কিভাবে"?

সদ্য রেপ হয়ে মারা যাওয়া মেয়েটার ফাইল খুললাম, জানোয়ারের মতো মেয়েটাকে মেরেছে ওরা। প্রথমে রেপ, তারপর লজ্জাস্থানে ছুরি দিয়ে আঘাত, হাত পায়ের আঙুল কাটা, উফফফ।
কতোটা যন্ত্রণার মৃত্যু। মেয়েটা নিখোঁজ হওয়ার ৫দিন পর আমরা মেয়েটার লাশ পাই।
কেসটা নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম। আমার মাথায় ই ছিলোনা আরশিতাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হবে।

প্রায় আধঘন্টা দেরি হয়ে গেলো। তাড়াহুড়ো করে আরশিতার স্কুলে গেলাম। সব বাচ্চারা ইতিমধ্যেই চলে গেছে, আরশিতাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। চারিদিক খুঁজলাম, আরশিতা নেই।
আরশিতার টিচার পলাশকে দেখলাম স্কুল থেকে বের হতে। দৌড়ে গেলাম ওনার কাছে। বললাম-
-পলাশ ভাই আরশিতা কোথায়"?
-আরে মেহরাব স্যার আপনি? আরশিতা কোথায় মানে কি? স্কুল তো ত্রিশ মিনিট আগেই ছুটি হয়ে গেছে। আর আজকে আপনি কেনো আসলেন? ভাবি কোথায়"?
আমি পলাশের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। স্কুল থেকে বের হয়ে আশপাশের সব দোকান খুঁজলাম, আরশিতা নেই।

আমার ভিতরটা দুমড়েমুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। হুট করে আমার মনে হলো মিহি হয়তো আরশিতাকে নিয়ে গেছে, একরাত মেয়েকে দেখেনি হয়তো তাই। মিহিকে কল দিলাম-
-হ্যালো মিহি, আরশিতাকে তুমি নিয়া গেছো স্কুল থেকে"?
-মানে? তুমি না আমাকে বললে স্কুল থেকে আনা নেওয়া কয়েকদিন তুমি করবে"।
আমি বুঝতে পারলাম মিহি কিছুই জানেনা। মিহিকে আর কিছু বলতেও চাইলাম না, টেনশন করে মারা যাবে একদম।
মিহি ওপাশ থেকে চিল্লায়া উঠলো-
-মেহরাব আমার মেয়ে কোথায়য়য়"?
আমি চুপ করে রইলাম।
মিহি এবার কান্না করতে করতে আরো জোরে বললো-
-মেহরাব কথা বলোওওওওও। আরশিতা কোথায়য়য়"?
আমি আস্তে করে বললাম-
-আরশিতাকে খুঁজে পাচ্ছিনা মিহি। স্কুলে ওকে নিতে এসে দেখি আরশিতা নেই। তুমি চিন্তা করিওনা, আমি আরশিতাকে খুঁজে বের করবো"।
মিহি ওপাশ থেকে জোরে জোরে কান্না করতে থাকলো। আমি ফোনটা কেটে দিলাম।

তাড়াতাড়ি থানায় আসলাম। প্রত্যেকটা থানায় আরশিতার ছবি মেইল করে বললাম যাতে বাস স্ট্যান্ড, সবগুলো পয়েন্ট, চেক করে তারপর যেনো গাড়ি ছাড়ে। বাসার দারোয়ান করিমকে কল দিলাম, বললাম "আরশিতা বাসায় আসলে আমাকে আর মিহিকে যেনো তাড়াতাড়ি কল দেয়"।
আমার মাথায় কোনোকিছু কাজ করছিলো না। হুট করে কি হয়ে গেলো?
একদিকে আরশিতাকে খুজে পাচ্ছিনা, অন্যদিকে রেপ হওয়া মেয়েটার খুনিরাও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওই মেয়েটাও কলেজের সামনে থেকে কিডন্যাপ হয়েছিলো"।


চলবে......